মুনাফা অর্জনের উদ্দ্যেশ্যে বৈধ উপায়ে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন, বণ্টন ও এর সহায়ক কার্যাবলিকে বলা হয় ব্যবসায় (Business)।
সাধারণভাবে ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন (Profit earning)।
ব্যবসায়ের প্রধান কাজ উৎপাদন।
অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক ব্যবসায়।
ব্যবসায়ের আবেদন ব্যক্তিক ও সামষ্টিক
যে ব্যবসায় গড়তে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ মূলধন বিনিয়োগ করেন কিন্তু তার পিছনে মুনাফা অর্জন বা লভ্যাংশ প্রাপ্তির কোনো উদ্দেশ্য থাকে না বরং সমাজের কল্যাণ ও দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যই থাকে মুখ্য তাকে বলে সামাজিক ব্যবসায় (Social business)। যেমন: ভালো কাজের হোটেল "এক টাকার আহার" প্রকল্প সামাজিক ব্যবসায়ের উদাহরণ।
সামাজিক ব্যবসায় ধারণার জনক নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।,
ব্যবসায় সমাজ বিজ্ঞান (Social Science)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
সমাজ বিজ্ঞানের জনক-Auguste Comte (1798-1857)।
ব্যবসায়ের মৌলিক ধারণা (BASIC CONCEPT OF BUSINESS):
ব্যবসায় অর্থ কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা।
ব্যবসায়ের উৎপত্তি মানুষের অভাববোধ থেকে।
ব্যবসায়ের প্রধান লক্ষ্য/স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য ~ মুনাফা অর্জন। (তবে সমবায় সমিতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্য/লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়। সমবায় সমিতির প্রধান লক্ষ্য সদস্যদের পাস্পরিক কল্যানসাধন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের প্রধান লক্ষ্য জনকল্যাণসাধন।)
ব্যবসায়ের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য/উদ্দেশ্য ~ সম্পদ সর্বাধিকরণ।
ব্যবসায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ~ উপযোগ ও উদ্বৃত্ত সৃষ্টি। উপযোগ হলো কোনো দ্রব্যের অভাব পূরণের ক্ষমতা। কোনো দ্রব্য যতো বেশি মানুষের অভাব পূরণ করতে পারবে, ঐ দ্রব্যের ব্যবসায় ততো বেশি সফল হবে।
ব্যবসায়ের বিবেচ্য বিষয়/মৌলিক উপাদান (BASIC ELEMENTS OF BUSINESS):
মুনাফা অর্জন/অর্থ উপার্জন
আইনগত বৈধতা
ব্যবসায়ী সওদা
সেবার মনোভাব
আর্থিক মূল্যে লেনদেন/বিনিময়
কর্মে স্বাধীনতা
পারস্পরিক সুবিধা
ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা
পুঁজির সংস্থান
পরিবর্তনশীলতা
লেনদেনের পৌনঃপুনিকতা
উপযোগ সৃষ্টি
পূর্বানুমান
বিক্রয়ের অভিপ্রায়
সম্পর্কের উন্নয়ন
মুক্ত বিশ্বে ব্যবসায়ের প্রকৃতি ~ সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ব্যবসায়ের প্রকৃতি ~ সামষ্টিক (সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ব্যবসায়কে সমষ্টিগতভাবে চিন্তা করা হয়)।
ব্যবসায় সংগঠিত হওয়ার আবশ্যকীয় পক্ষ হলো ~ ক্রেতা ও বিক্রেতা
ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না ~ গতিশীলতার দৃষ্টিভঙ্গি।
ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে ~ পরিবর্তনশীলতার দৃষ্টিভঙ্গি।
ব্যসায়ের আবশ্যিক কাজ নয় ~ জনসেবা।
ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য
অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য
সামাজিক উদ্দেশ্য
মানবিক উদ্দেশ্য
জাতীয় উদ্দেশ্য
1. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য
মুনাফা অর্জন
মূলধন বিনিয়োেগ
উৎপাদন ও অভাবমোচন
সম্পদের সদ্ব্যবহার
ক্রেতা সৃষ্টি
জনশক্তির সদ্ব্যবহার
নতুনত্ব উদ্ভাবন
স্থায়িত্ব ও উন্নতি
2. সামাজিক উদ্দেশ্য
ন্যায্যমূল্যে পণ্য ও সেবা সরবরাহ
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন
অসামাজিক তৎপরতা বর্জন
জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ
3. মানবিক উদ্দেশ্য
ন্যায্য বেতন প্রদান
সরবরাহকারীদের উপযুক্ত মূল্য প্রদান
মানবীয় সম্পর্ক সৃষ্টি
উপযুক্ত কার্য পরিবেশ সৃষ্টি
চাকুরির স্থায়িত্ব বিধান
শ্রমিক কল্যাণ
4. জাতীয় উদ্দেশ্য
অথনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ়করণ
জাতীয় সম্পদ ও আয় বৃদ্ধি
আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন
বেকারত্ব দূরীকরণ
দেশরক্ষা
ব্যবসায়িক সওদা (BUSINESS MERCHANDISE):
ব্যবসায়ের প্রধান উপকরণ/সওদা পণ্যের ভোগ বলা হয় ~ পণ্য বা সেবাকে (product or service)। অর্থাৎ ব্যবসায়ী যা নিয়ে ব্যবসায় করে তাকেই ব্যবসায়িক সওদা (merchandise) বলা হয়।
মুদি দোকানির কাছে ব্যবসায়িক সওদা হলো চাল, ডাল, তেল, লবণ ইত্যাদি।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ের সওদা হিসাবে গণ্য করা হয় ~ অর্থ, ঋণ ও মতাদর্শকে।
ব্যবসায়ের সংজ্ঞাভুক্ত নয় (EXCLUSION LIST) এমন আরো কয়েকটি উদাহরণ হলো:
ঘটনা ব্যবসায় না হওয়ার কারণ
মাতা-পিতার সেবা বা স্নেহ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়/বিক্রয়যোগ্য নয়/আর্থিক মূল্য নিরূপন অযোগ্য
সিন্ডিকেট (syndicate)/অস্ত্র তৈরি অবৈধ (illegal)
ব্যবসায়িক ফরমায়েশ (order) ফরমায়েশ কোনো লেন-দেন নয়, এটি শুধু পণ্য ক্রয়ের আদেশ প্রদান।
নিজস্ব ব্যবহারিক গাড়ি বিক্রয় পৌনঃপুনিকতার অভাব (lack of repetition)
নিজস্ব ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের অভিপ্রায় (ইচ্ছা) নেই
এছাড়া ব্যবসায়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুতে ব্যবসায়িক ক্ষতি ব্যবসায়ের আওতাভুক্ত নয়। ব্যবসায়ের উদাহরণ হলো ~ বিউটি পার্লার, মডেলিং, বিমান চলাচল, পরামর্শ দান, ডিলারশিপ ইত্যাদি।
এক নজরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ (GOALS OF BUSINESS):
ব্যবসায়ের ধরন উদ্দেশ্য
একমালিকানা ব্যবসায় মুনাফা অর্জন (Profit earning)
অংশীদারি ব্যবসায় মুনাফা অর্জন (Profit earning)
যৌথমূলধনি ব্যবসায় মুনাফা অর্জন (Profit earning)
সমবায় সমিতি সদস্যদের পারস্পরিক কল্যাণ সাধন (Mutual help of members)
রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় জনকল্যাণ (Public welfare)
ব্যবসায় জোট ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা হ্রাস ও একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার (Reducing competition and creating monopoly)
যৌথ হিন্দু পারিবারিক ব্যবসায় পারিবারিক কল্যাণ সাধন ও মুনাফা অর্জন (Family welfare and earning profit)
মুনাফা অর্জনের গুরুত্ব (IMPORTANCE OF EARNING PROFIT):
P.F. Drucker-এর মতে নিম্নোক্ত ৪টি কারণে ব্যবসায়কে আবশ্যিকভাবে মুনাফা অর্জন করতে হয়:
ব্যবসায়ের দক্ষতা (efficiency) পরিমাপের জন্য
ব্যবসায়ে ঝুঁকি (risk) গ্রহণের জন্য
পুনঃবিনিয়োগের (re-investment) জন্য
ব্যবসায়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য
ব্যবসায় ঝুঁকি গ্রহণে অনুপ্রেরণা যোগায় ~ মুনাফা।
ব্যবসায়ের মুনাফার সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত ~ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা।
মুনাফাকে বলা হয় ~ ঝুঁকি গ্রহণের পুরস্কার (reward for bearing risk and uncertainty--F.H. Night)
ব্যবসায়ের দক্ষতা ও কার্যকারিতার মাপকাঠি হলো ~ মুনাফা।
প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসায়ের পরিচয় ~ দক্ষতার খেলা হিসাবে।
সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের প্রধান উপায় ~ বেশি বেশি ক্রেতা আকর্ষণ।
সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের প্রধান উপাদান ~ বেশি ক্রেতা আকর্ষণ।
ব্যবসায়ের কাম্য আয়তনে মুনাফা ~ শূন্য (আয় ব্যয়)। (আয়-ব্যয় যেখানে সমান থাকে)
ব্যবসায়ের কাম্য আয়তন বলতে ~ সম আয়-ব্যয় বিন্দু (Break-Even Point)-কে বোঝায়।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও জনকের নাম:
বিষয় (Subject) জনক (Father)
সমাজ বিজ্ঞান (Social Science) Auguste Comte
রাষ্ট্র বিজ্ঞান (Political Science) Aristotle
অর্থনীতি (Economics) Adam Smith
ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Micro Economics) Adam Smith
সামষ্টিক অর্থনীতি (Macro Economics) John Maynard Keynes
আধুনিক অর্থনীতি (Modern Economics) Paul Samuelson
বিপণন (Marketing) Philip Kotler
অর্থনীতি ও উৎপাদন (ECONOMICS AND PRODUCTION):
ব্যবসায়ের অন্যতম প্রধান কাজ পণ্য ও সেবা সামগ্রী উৎপাদন (Producing goods and service)।
অর্থনীতিতে উৎপাদন বলতে বোঝায়-উপযোগ সৃষ্টি করা (utility generation)
অর্থনীতির জনক (father) বলা হয়- অ্যাডাম স্মিথকে। তিনি মূলত ব্যষ্টিক অর্থনীতির (Micro economics) ধারণা প্রণয়ন করেন।
Adam Smith-এর বিখ্যাত গ্রন্থ Wealth of Nations। তিনি বইটিতে ব্যষ্টিক অর্থনীতির ধারণা আলোচনা করেন।
অর্থনীতি বিষয়ক বিষদ আলোচনা সম্বলিত প্রথম গ্রন্থ-Wealth of Nations। বইটির পূর্ণ নাম "An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations" যা সংক্ষেপে Wealth of Nations নামে পরিচিত।
Wealth of Nation প্রকাশিত হয়-১৭৭৬ সালে।
ব্যবসায়কে মাঝে মাঝে বলা হয়- Applied Economics |
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উৎপত্তি মানুষের অভাববোধ ও তা পূরণের প্রচেষ্টা থেকে।
ব্যবসায়ের জীবনী শক্তি বলা হয় পুজি/ অর্থ/মূলধনকে।
ব্যবসায়ের কার্যাবলি (FUNCTIONS OF BUSINESS):
ব্যবসায়ের কাজ হলো মূলত তিন ধরনের। যথা:
১. পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম উৎপাদন (production)
২. উৎপাদিত পণ্য ও সেবা প্রকৃত ভোগকারীর নিকট বণ্টন (distribution) এবং
৩. উৎপাদন ও বণ্টন কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়ক উপযোগ সৃষ্টি করা।
অতএব, ব্যবসায়ের সমীকরণ হলো:
Β = ΣΙ+ΣΤ+ΣΑΤ
এখানে, B = ব্যবসায়:
I = শিল্পের কার্যাবলির সমষ্টি (শিল্প) Industry
ΣΤ = পণ্য বা সেবা বিনিময় (ক্রয়-বিক্রয়) সংক্রান্ত কাজের সমষ্টি (বাণিজ্য)- Trade ও
ΣΑΤ = পণ্য বা সেবা বিনিময় বা ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত অন্যান্য কাজের সমষ্টি (বাণিজ্য) Auxiliaries to Trade.
বি.দ্র. Σ - এর অর্থ হলো Sum বা সমষ্টি।
ব্যবসায়ের সাধারণ কার্যাবলি (GENERAL FUNCTIONS OF BUSINESS):
১. উৎপাদন
২. ক্রয়
৩. বিক্রয়
৪. পরিবহণ
৫. অর্থ সংস্থান
৬. গুদামজাতকরণ
৭. বিমাকরণ
৮. বিজ্ঞাপন ও প্রচার
৯. হিসাবরক্ষণ
১০. প্রমিত করণ ও পর্যায়িত করণ
১১. বাজার গবেষণা
১২. প্রত্যক্ষ সেবাদান
১৩. মোড়কিকরণ
১৪. কর্মসংস্থান
১৫. ব্যবস্থাপনা
১৬. দাপ্তরিক কাজ
১৭. কর্মীসংক্রান্ত কাজ
ব্যবসায় ও সংশ্লিষ্ট আইন (BUSINESS & RELATED ACTS):
মানুষের কোনো কাজ ব্যবসায়ের অন্তর্গত হবে তখনই, যখন তা-আইনসম্মত (legal) হবে।
আইনসম্মত নয় এমন কোনো কাজকে কখনই ব্যবসায় বলা হবে না। এজন্যই চুরি করা বা মানি লন্ডারিং করার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যবসায় গঠন করা যায় না।
এক নজরে বাংলাদেশে ব্যবসায়ের জন্য প্রণীত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ আইন:
ব্যবসায়/ক্ষেত্র
আইন
একমালিকানা ব্যবসায় (Sole proprietorship) নিজস্ব কোনো আইন নেই। তবে পৌর এলাকায় হলে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে। তাছাড়া দেশে বহাল সকল আইন মেনে চলতে হবে। অবৈধ কোনো কাজের জন্য একমালিকানা ব্যবসায় গঠন করা যাবে না।
অংশীদারি ব্যবসায় আইন (Partnership Act) ১৯৩২ সাল
ব্যাংকিং কোম্পানি আইন (Banking Company Act) ১৯৯১ সাল (সংশোধিত ২০১৩)
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন(Financial Institution Act) ১৯৯৩ সাল
যৌথমূলধনি কোম্পানি আইন(Joint Stock Company Act) ১৯৯৪ সাল (সংশোধিত ২০২০)
সমবায় সমিতি আইন(Co-operative Society Act)
২০০১ সাল
অর্থ, ঋণ, আদালত আইন (Money, Loan, Court Act)
২০০৩ সাল
বিমা আইন (Insurance Act)
২০১০ সাল (এই আইনটি প্রণয়নের মাধ্যমে পূর্বের বিমা আইন ১৯৩৮-কে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে)
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (Money Laundering Prevention Act) ২০১২ সাল (সংশোধিত ২০১৫)
চুক্তি আইন(Contract Act) ১৮৭২ সাল
হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন (Negotiable instrument Act) ১৮৮১ সাল
বৈদেশিক বিনিময় নিয়ন্ত্রণ আইন (Foreign Exchange Regulation Act) ১৯৪৭ সাল
একটি ব্যবসায়কে দেশের প্রচলিত সকল আইন ই মেনে চলতে হয়। তবে সাধারণত ঝামেলা এড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ের গঠন ও পরিচালনার জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করা হয়।